মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে অনেকক্ষণ আগেই। অসহ্য গরমে এমন ঝাঁপিয়ে পড়া বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি এলো কলকাতা বাসীর প্রাণে। আকাশে মেঘের তর্জন-গর্জন উপেক্ষা করে সায়েন্স সিটি থেকে একটা ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম আমরা। গন্তব্য ৬ বালিগঞ্জ প্লেস। নীলার পিসির বাড়ি। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট মেকআপ আয়নাটা বের করে নিজের অবয়বটা এক নজর দেখে নিলো সে। ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপস্টিক আলতো করে মেখে নিয়ে ব্যাগ থেকে একটি পারফিউম বের করলো। তারপর হটাৎই আমার ডান হাতটা টেনে নিয়ে বার তিনেক স্প্রে করে দিলো হাতের উল্টো পিঠে।
“ঘ্রাণটা কেমন দেখো তো?” নীলা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো।
আমি কিছুটা অবাক হয়ে সুবোধ বালকের মতো হাতটা নাকের কাছে নিয়ে সুবাস অনুভব করলাম। তারপর মৃদু হেসে ঘাড়ে আলতো করে স্পর্শ করতে করতে বললাম, “যদিও আমি পারফিউম ব্যবহার করি না, তবে তোমার পছন্দ আছে বলতে হবে। এটার ঘ্রাণ তেমন স্ট্রং না, নাহলে মাথা ব্যাথা ধরে যেতো এতোক্ষণে।” নীলা হেসে আমার দিকে তাকাল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “জানো, তোমার শরীরের ঘ্রাণও ঠিক এমন। প্রথম যখন তোমার সাথে কথা বলি, তখন থেকেই মনে হয় যেন একটা মৃদু ঘ্রাণ ঘিরে থাকে আমাকে।”
আমি চমকে উঠলাম। এত সরাসরি সে বলবে ভাবিনি। কণ্ঠে খানিকটা দ্বিধা নিয়ে বললাম, “কীভাবে? এতটা কীভাবে অনুভব করলে?” নীলা মুচকি হেসে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “যখন তোমার সাথে ফেসবুকে কথা শুরু হলো, তখনই। তোমার সেই নির্দিষ্ট মৃদু ঘ্রাণ, যেন অনুভবের মধ্যেই রয়ে গেছে। আজ যখন সামনাসামনি দেখা হলো, জানি না কেনো, সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।”
ততক্ষণে আমি গাড়ির গ্লাস দিয়ে বাইরের আকাশে মেঘেদের গোল্লাছুট খেলা দেখছি। বৃষ্টি কিছুটা কমলো বলে মনে হচ্ছে। নীলার কথা শুনে লজ্জায় পড়ে গেলাম আমি। কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। কি বলবো তা ভেবে না পেয়ে অস্বস্তি এড়াতে বললাম, গান শুনবে একটা? আমার খুব পছন্দের। এই বৃষ্টিস্নাত শেষ বিকেলের সাথে বেশ মিল আছে।
ক্ষীণ কন্ঠে হ্যাঁ বলে আমার দিকে একবার তাকালো। ঈষৎ লাল হয়ে আছে তার চেহারা। চোখেমুখে লজ্জার ছাপ। আমি দেরি না করে মোবাইলে অঞ্জন দত্তের “একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে” গানটি চালিয়ে দিলাম।
চৈত্রের এমন মাটি-ফাটা নির্দয় গরমের দিনে অপ্রকাশিত অবিশ্রান্ত বর্ষণে পুরো কলকাতা যেনো আজ মেতে উঠলো। আর কিছুক্ষণ পরপর মেঘেদের কোন্দলে কেঁপে কেঁপে উঠছে শহরের বিশাল সব অট্টালিকা। রাস্তায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে কয়েকটি পথশিশু খেলা করছে। দূরে কোনো এক বিল্ডিংয়ের এক বারান্দায় এক মা তার ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে। আমি আর নীলা পাশাপাশি বসে আছি ট্যাক্সিতে। মোবাইলে বাজছে “একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে, আমরা ধরা পড়ে যাবো দেখো ঠিক…….”
নীলা, নীলা মুখার্জী। কলকাতার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজ থেকে MBBS শেষ করলো বছর খানেক আগে। এখন কোনো এক হসপিটালের রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত। আমি অনন্ত, অনন্ত বিশ্বাস। পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। বর্ধমানের একটি মাধ্যমিক স্কুলে আমরা একসাথে পড়তাম। স্কুল জীবন শেষ করে কলকাতার এক নামীদামী কলেজে ভর্তি হয় নীলা। মাধ্যমিকে একসাথে পড়ালেখা করলেও কখনো এক বাক্যের জন্যও কথা হয়নি আমাদের। আমি আর নীলা যে একই স্কুলে, একই সাথে পড়তাম তা সে জানতোই না। ভাবা যায় অবস্থা! অবশ্য না চেনারই কথা আমাকে। এর অনেক কারনও আছে৷ তা যাকগে, নীলার তূলনা যে অন্য কারো সাথে চলে না সেটা নিয়ে চেনা-জানা কারো মধ্যে দ্বিমত নেই। নীলাকে নিয়ে লিখতে গেলে আমার শব্দ ভান্ডারে শব্দের ঘাটতি পড়ে যায়৷ কিসের সাথে তূলনা করা যায় নীলাকে? হ্যাঁ, আকাশের সাথে।
আকাশের যেমন অসীমতা, গভীরতা, পরিবর্তনশীলতা এবং সৌন্দর্য আছে, তেমনই নীলারও। তার আছে অপরিসীম সম্ভাবনা, অনুভূতির গভীরতা এবং সৌন্দর্য। আকাশ যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ নেয় – কখনো শান্ত, কখনো মেঘাচ্ছন্ন, কখনো সূর্যের রশ্মিতে উজ্জ্বল, তেমনি নীলাও।
দুর্দান্ত মেধাবী হওয়া ছাড়াও নীলার আরেকটি ঐশ্বরিক গুণ আছে। নীলা যেন ঊষার আকাশে উদিত এক স্বর্ণালী সূর্য, যার কিরণে চারিদিক আলোকিত হয়ে ওঠে। যার সৌন্দর্যে জেগে ওঠে প্রভাতের রঙিন কুসুম। তার হাসি যেন বসন্তের মৃদুমন্দ বায়ু, যা হৃদয়ে এনে দেয় এক স্নিগ্ধতার স্পর্শ। আর যৌবনের ঐশ্বর্য যেন দেবীর রূপকথা, যার সামনে প্রকৃতির সকল সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়।”
প্রায় ১০-১১ বছর পর নীলাকে দেখলাম সামনা-সামনি। এই প্রথম এতো কাছ থেকে দেখা তাকে। বছর চারেক আগে তাকে ফেসবুকে খুঁজে পেয়েছিলাম। রিকোয়েস্ট দেবার তিন মাস পর একসেপ্ট করে সে৷ একদিন মেসেঞ্জারে এক অনাকাঙ্ক্ষিত নোটিফিকেশন দেখে চমকে উঠি। নীলার মেসেজ। ধড়ফড় শুরু হয়ে যায় বুকে।
“কেমন আছো?” নীলার প্রথম বার্তার এই সাধারণ বাক্যটাই যেন আমার পৃথিবীকে উল্টেপাল্টে দিল। এতদিন পর, এত দূর থেকে তার একটি মেসেজ যেন আমার হৃদয়ের গভীরতম কোণে জমে থাকা অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলল। আমি উত্তর দিলাম, “ভালো, তুমি কেমন?”এরপর ধীরে ধীরে কথার শুরু হলো আমাদের। প্রথম দিকে স্বাভাবিক কিছু কথোপকথন, তারপর সময়ের সাথে বেড়ে গেলো মেসেজের পরিধি। জানলাম তার কলেজ, পড়াশোনা, হসপিটালের দায়িত্ব। একসময় গল্পে উঠে এলো পুরোনো দিনের স্মৃতিরা। স্কুলের দিনগুলো, আমাদের পরিচয়হীনতা, এবং আমাদের বর্তমান জীবন।এভাবেই আমাদের অনলাইন আলাপচারি এগিয়ে চললো কিছুদিন। তারপর একদিন নীলা জানালো, সে এখন কলকাতায়। এখানেই চাকরির সূত্রে তার স্থায়ী বসবাস। সুযোগ পেয়ে আমি তখনই তাকে প্রস্তাব দিলাম দেখা করার। কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও নীলা রাজি হলো। সেই সূত্রেই আজকের এই দেখা।
গাড়ির জানালার বাইরে তখনও মেঘেদের গোল্লাছুট চলছে। শহরের রাস্তায় জমে থাকা পানিতে গাড়ির চাকা শোঁ শোঁ শব্দ তুলে এগিয়ে চলছে। নীলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “অনন্ত, তুমি জানো, আজকের এই বৃষ্টিতে আমার খুব একা লাগছে। মনে হচ্ছে, যেন কোনো এক অজানা বিষাদ আমাকে ঘিরে ধরছে।” আমি একটু চমকে তার দিকে তাকালাম। নীলা যেরকম সরল আর সপ্রতিভ, তাকে এইভাবে বিষন্ন হতে কখনও দেখিনি। বললাম, “কেনো এমন লাগছে তোমার? সব ঠিক তো?” নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। এরপর ধীরে ধীরে তার মুখের লাজুক অভিব্যক্তি আর শঙ্কা মিশ্রিত মেঘ কেটে গেল। গভীর এক শ্বাস ফেলে বলল, “অনন্ত, তোমার সাথে কথা বলতে বলতে আমার মনে হয়, যেন একটা অসমাপ্ত গল্পের মতো আছি আমি। তোমাকে জানাতে চেয়েও পারিনি এতদিন।”
নীলা তার চোখ দুটো মেলে আমার দিকে চেয়ে রইল। মনে হলো যেন কোনো অজানা ঝড় আছড়ে পড়তে চলেছে তার চোখের গভীর থেকে। “জানো অনন্ত, আমি আজকাল প্রায়ই ভাবি যদি সেই স্কুলজীবনেই আমাদের দুজনের দেখা হতো, কথা হতো, তাহলে হয়তো আমার জীবনের অনেক কিছুই অন্যরকম হতো। আমি জানি, এটা বলা হয়তো অর্থহীন, কারণ সময়কে তো আর ফেরানো যায় না। তবুও, আমি যখনই তোমার সাথে থাকি, মনে হয় একটা অতীতকালের স্বপ্ন যেন সত্যি হতে চলেছে। আমি বুঝতে পারি, তোমার প্রতি আমার একটা গভীর অনুভূতি রয়েছে, যা শুধুই বন্ধুত্ব নয়।” তার মুখ থেকে এতখানি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি শুনে কিছুক্ষণের জন্য কথা হারিয়ে ফেললাম। এতদিন যে অনুভূতিকে আমার হৃদয়ের গভীরে চেপে রেখেছিলাম, সেটাই যেন এবার নীলার কণ্ঠে ফুটে উঠল। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “নীলা, আমি জানি না কি হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। তবে এটুকু বলবো, আমার হৃদয়েও তোমার জন্য এমন কিছু অনুভূতি আছে, যা আমি আজও তোমাকে বলতে পারিনি।” নীলার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে বলল, “তাহলে কি আমরা দুজনেই এতদিন নিজের নিজের অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে রেখেছিলাম?” আমি হেসে বললাম, “হয়তো তাই। কিন্তু আজকের এই বৃষ্টিভেজা বিকেলে আমাদের গল্পটা যেন নতুন করে শুরু হলো।” গাড়ি তখন ৬ বালিগঞ্জ প্লেসের দিকে ছুটে চলেছে। বৃষ্টি আরও একটু থেমেছে ততক্ষণে।
৬ বালিগঞ্জ প্লেসে নেমে নীলার পিসির বাড়ি ঢুকলাম আমরা। পিসতুতো বোন ঈশিতার আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম। বিদায় মুহূর্তে নীলা এগিয়ে দিতে এলো আমাকে। তার চোখে তখনও সেই অস্পষ্ট দ্যুতি। বলেছিলো, “দেখা হবে আবার, অনন্ত।” আমার মন বলছিলো, হয়তো এটাই ছিল আমাদের গল্পের নতুন সূচনা। কিন্তু বাস্তবতা যেন আরেকটা পথে হাঁটতে শুরু করল। সেই দিনের পর থেকে কিছুদিন নীলার সাথে ফোনে কথা আর মেসেজ চললো। একসময় মনে হতে লাগল, তার কথায় একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। আমাদের গল্পের সেই সহজ-সরল হাসির বদলে এলো এক ধরনের ম্রিয়মানতা। আমি বারবার চেষ্টা করেছি তাকে জানার, বুঝার, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য প্রাচীর যেন তৈরি হয়ে গিয়েছিলো তার চারপাশে। কিছুদিন পর হঠাৎ করেই নীলা আমার মেসেজের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিল। ফোন করলে ব্যস্ত, ক্লান্তির অজুহাত দিতো। মনের গভীরে একটা অজানা শঙ্কা নিয়ে তাকে বারবার খুঁজতে লাগলাম, তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নীলা যেন নিজেকে একটা অন্তরালে নিয়ে গেল। তারপর একদিন, অনেক অপেক্ষার পর আমি নিজেই তাকে ফোন করলাম। ফোনটা একবারে ধরে নিল সে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর যেন অতীতের সেই চিরচেনা নীলার মতো ছিল না। আমি বললাম, “নীলা, কি হয়েছে তোমার? কেনো এভাবে দূরে সরে যাচ্ছো?”
নীলার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “অনন্ত, আমাদের গল্পটা মনে হয় এখানেই শেষ হওয়া উচিত। জানি তুমি ভেবেছিলে আমরা একটা নতুন অধ্যায় শুরু করবো। কিন্তু আমি আর পারছি না। আমার জীবন, আমার কাজ সবকিছুই খুব জটিল হয়ে গেছে। তোমার মতো একজন সরল ও স্নিগ্ধ মানুষের পাশে আমার থাকা উচিত নয়।” আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। “এটা কেমন কথা? আমাদের কি একবার বসে এই নিয়ে কথা বলা উচিত নয়?” বললাম একটু ক্ষীণ কণ্ঠে। নীলা বললো, “অনন্ত, আমি জানি তুমি আমাকে বুঝতে পারবে। আমার জীবনের বাস্তবতা আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যেখানে নিজের অনুভূতিগুলোকে দমিয়ে রাখতে হয়। তোমার প্রতি আমার যা অনুভূতি ছিলো, তা হয়তো ছিলোই। কিন্তু সেটা এখন আর সম্ভব নয়। তোমার জীবনে কেউ আসবে, যে তোমার জন্যই তৈরি, আমার মতো কেউ নয়।” বলে ফোনটি কেটে দিলো নীলা।
এটাই ছিল আমাদের শেষ কথা। এরপর আর কখনও নীলা যোগাযোগ করেনি, আমিও ধীরে ধীরে চেষ্টা করেছি সেই স্মৃতিগুলোকে ভুলে যেতে।
আজ আবার বৃষ্টি। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। বুকের ভেতর কোথাও একটুখানি শূন্যতা। কিন্তু আজ আর সেই শূন্যতা থেকে পালাচ্ছি না। নীলার কথা, তার সেই শেষ বিকেলের হাসি, বৃষ্টিতে ভেজা মুখ, সব স্মৃতি যেন এক অভিজ্ঞতার মতো মনের গভীরে বয়ে বেড়াচ্ছি। হয়তো নীলার দূরত্বের পেছনে অনেক কারণ ছিলো, যা আমি কোনোদিন জানবো না। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো, যা কখনও মনের মেঘে জমে থাকে, আবার কখনও ঝরে পড়ে। জানি, জীবনের এই বৃষ্টিতে আমাদের গল্পটা মিশে গেছে। গল্পের শেষটা আমার মনের ভেতরে বয়ে নিয়ে চলি। আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, কিছু সম্পর্ক শুধুই এক মুহূর্তের জন্য, এক বৃষ্টিভেজা বিকেলের জন্য। তারপর তারা হারিয়ে যায় অনন্তের আকাশে, ঠিক যেমন নীলা হারিয়ে গেছে।
আকাশে মেঘেরা গোল্লাছুট খেলতে থাকে। আমি একা দাঁড়িয়ে থাকি। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেনো বলে যায়, “সব গল্প শেষ হয় না, কিছু গল্প থেকে যায় অপূর্ণ।”
Espoo, Finland
28 September 2024