Menu
Picture of Abdullah Al Marouf

Abdullah Al Marouf

Writer

Share this blog:

সা ক্ষা ৎ কা র

চোখ বন্ধ করে অফিসের সোফায় হেলান দিয়ে সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে গুনগুন করে গেয়ে উঠলাম, ‘বঁধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায়, বিনা কারণে…..।’

পিছন থেকে কাঁধে ধাক্কা দেয়ায় সম্বিত ফিরে এলো আমার।

বাবু, কতবার ডাকলাম আপনাকে, সাড়া দেননি বলে একটু গতর খাটালাম আর কি। তা আজ দুপুরে খানাপিনা কিছু আনবো নাকি? সামনের দাঁত গুলো কেলিয়ে কেলিয়ে কথাগুলো বললো মতি মিয়া।
না থাক, আজ আমি নিজে গিয়েই খেয়ে আসবো বাইরে থেকে৷ খানিকটা বিরক্তি সূচক গলায় বললাম আমি।

জ্বী, আজ্ঞে বাবু। বলে বিদায় নিলো মতি মিয়া।

অফিসের কাজকর্মে বেশ হ্যাঁপা ধরে গেলো। ক’মাস যে খাটাখাটুনি গেলো না। ইদানীং কাজের ফিরিস্তি যদিও কিছুটা কমেছে। তাই এখন মাঝেমধ্যে গুণগুণ গলায় গান বের হয় আমার। কোথাও ঘুরতে গেলে মন্দ হতো না। মনটা ইদানীং সমুদ্রবিলাসে যেতে চাচ্ছে। লাঞ্চে যাবার আগে বড় কর্তার অফিসে ঢুঁ মেরে এলাম। খানিকটা ইনিয়েবিনিয়ে ৪ দিনের ছুটি বাগিয়ে এনেছি। আগামী পরশু একটি সলো ট্রিপে যাচ্ছি কক্সবাজার। নৈসর্গিক সমুদ্রাভিজানে আমার সঙ্গী হলো জামাকাপড়ের একটি ব্যাগ আর প্রিয় ক্যামেরাটি। কক্সবাজার শহরের কোলাহল আর গিঞ্জি পরিবেশ এড়াতে বুক দিলাম ইনানী বিচ পার হয়ে চার-তারকা বিশিষ্ট এক হোটেলে। সিঙ্গেল বেড, সী-বিচ ভিউ রুম উইথ বেলকনি, ও ইত্যাদি ইত্যাদি। নির্দিষ্ট দিনে হোটেলে চেক-ইন করতে করতে রাত হয়ে গেলো। আর বাহিরে বের হলাম না সেদিন। গোসল, আর ডিনার করে দিলাম একটা লম্বা ঘুম।

পরেরদিন সকাল বেলা কম্পলিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট শেষ করে বের হলাম সমুদ্র দেখবো বলে। মানুষের আনাগোনা খুব একটা নেই এখন এদিকে। দু-একটা লোক থেমে থেমে “প্যারাসেলিং করে যান” বলে হাঁক-ডাঁক দিচ্ছে। দুটো বাচ্চা সমুদ্রের ঢেউয়ের টানে ভেসে আসা ঝিনুক কুড়িয়ে কুড়িয়ে পকেটে চালান করে দিচ্ছে৷ একদল তরুণ-তরুণী হাঁটু জলে নেমে যে যার মতো করে ছবি তুলছে। এক উসকোখুসকো চেহারার ষোল-সতেরো বছরের ফটোগ্রাফার সকলের দারস্থ হচ্ছে ছবি তোলার জন্য। সকালের কাঁচা-সোনা রোদ যখন সমুদ্রের শান্ত জলে পড়ে, তখন জল যেনো সোনালি আয়নায় রূপান্তরিত হয়। প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি ঝিকিমিকি মনে হয় যেনো প্রকৃতির হাতে আঁকা কোনো মায়াবী চিত্র। সূর্যের কোমল আলোর স্পর্শে সমুদ্রজল এক অপার্থিব সৌন্দর্যের ভাষা বলে, যেখানে আকাশ আর পানির সীমানা মিলেমিশে যায়। এ সৌন্দর্য যেন এক নিঃশব্দ সিম্ফনি, যেখানে আলো আর জলের স্পর্শে সৃষ্টি হয় চিরন্তন এক ভালোবাসার গান। সমুদ্রের বুকজুড়ে জেগে ওঠা সোনালি আভা আর ঢেউয়ের মৃদু গুঞ্জনে যেন প্রকৃতি তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখে চলে। এই চমৎকার মূহুর্তগুলো আমি ক্যামেরায় ফ্রেম বন্দী করতে একটুও কালবিলম্ব করলাম না।

কাছাকাছি দূরত্বে একটি পাথরে হাঁটু ভাজ করে বসা এক ব্যক্তির উপর লক্ষ্য পড়লো আমার৷ গায়ে টি-শার্ট, পরনে জিন্স আর কাঁধে একটা স্লিং ব্যাগ। আমি এখানে আসা অবধি এখন পর্যন্ত লোকটি আনমনে ওই দূরে কোথাও যেনো এক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কোনো হেয়ালি নেই, এদিক-সেদিক তাকানো নেই, এ যেনো এক অদ্ভুত ব্যাপার! খানিকক্ষণ পর ক্যামেরার লেন্স দিয়ে লোকটিকে দেখার চেষ্টা করলাম। একি! কোথাও যেনো দেখেছি তাকে ইতিপূর্বে! মৃদু চিৎকার করে বলে উঠলাম আমি। আবার লোকটির দিকে লেন্স তাক করে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। প্রায় ৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর একটি সিদ্ধান্তে আসতে হলো আমাকে। লোকটিকে আমি চিনি, মানে আমার পূর্ব পরিচিত। তবে এখনো কিছুটা বিস্ময়ের আছে এখানে। এতসব ভাবতে ভাবতে হাঁটা লাগালাম লোকটির দিকে৷ ঠিক পিছনে এসে ডাক ছাঁড়লাম, দাদা, আরে ও অনন্ত’দা!

মাথাটা ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরলো লোকটি। কে অয়ন চৌধুরী? তুই এখানে? বিস্ময়ের সূরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো সে।
কলকাতার বিখ্যাত অনন্ত বিশ্বাস হটাৎ করে কক্সবাজারে! কি সৌভাগ্য আমার! কবে এলেন এখানে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
গত পরশু এসেছি, কালকের ফ্লাইটে চলে যাবো আবার কলকাতায়। বললো অনন্ত’দা।

তা দাদা, তোমার এই অবস্থা হলো কি করে? জিজ্ঞেস করলাম আমি। মাসের পর মাস শেভ না করার ফলে মুখে এক ধরনের অগোছালো ক্লান্তি জমেছে। চেহারায় গভীর এক ঝড়ের দাগ, যা তার জীবনসংগ্রামের নীরব সাক্ষী। কিন্তু এমনটা তো তিনি ছিলেন না আগে!

কিছু না রে, তুই কেমন আছিস? সব ঠিকঠাক তো? জিজ্ঞেস করলো অনন্ত’দা।
আমি ঠিক আছি, দিব্যি যাচ্ছে। তোমার কথা বলো তো দাদা। তুমি এতটা বদলে গেলে কিভাবে? তোমাকে তো চিনতেই পারি নি আমি৷ কি হাল করেছো চেহারার! তা বাংলাদেশে আসলে আর আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন ও মনে করলে না? খানিকটা অভিমানের সূরেই জিজ্ঞেস করলাম আমি।
এইতো বেঁচে আছি। এটাই তো এখন অনেক বড় পাওয়া। বলে চুপ করে গেলো দাদা।
তুমি কিছু লুকাচ্ছো কিন্তু আমার কাছ থেকে। বিয়ে-শাদী করেছো নাকি? মিস মুখার্জীর কি খবর? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
মুখার্জী নামটি শুনেই কেমন যেনো অপ্রস্তুত হয়ে গেলো দাদা। মুখটা বিষন্নতায় ভরে গেলো তার।
প্রসঙ্গ এড়াতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা তোমার ব্যবসা-বাণিজ্যের কি খবর এখন?
অনেকটা উদাস ভঙ্গিতে বললো সে, এখন আর আগের মতো নেই কিছুই।

খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, কিছু লুকাচ্ছো তুমি আমার কাছ থেকে দাদা। বলো না প্লিজ।

স্লিং ব্যাগ থেকে ধীর হাতে একটি সিগারেট বের করে আগুন জ্বালালো অনন্ত’দা। প্রথম টানেই ধোঁয়ার মেঘে ডুবে গেলো তার সমস্ত অস্তিত্ব। নির্বাক দৃষ্টি মাঝ সমুদ্রের দূর সীমানায় স্থির হয়ে গেলো, যেনো সেখানে হারানো কিছু খুঁজে ফিরছে। চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতার ছায়া। মুহূর্তের মৌনতা ভেঙে ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠলো-
“আমি তখন কলকাতার বউবাজার স্ট্রিট মানে বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটে নতুন অফিস নিয়েছি আরেকটা। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখালিখি ঠিক চালিয়ে যাচ্ছিলাম৷ মিস মুখার্জী, মানে নীলা মুখার্জীর সাথে সম্পর্কের পথ অঘোষিতভাবে থেমে যাওয়ার পর আমার জীবনের প্রতিটি কোণ শূন্যতায় ডুবে গেল। পলে পলে অনুভব করেছি তাকে। নীলাকে নিয়ে লিখালিখি করতাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছদ্মনামে। একদিন তাকে নিয়ে আমার একটি লিখা তার দৃষ্টিগোচর হলো। লিখাটায় তাকে খাটো করে কিংবা অসম্মান করে একটা শব্দও লিখা হয় নি। লিখাটা যে তাকে নিয়েই লিখা হলো তা মিস মুখার্জী তথা নীলা বুঝতে পারলো।

লিখাটি পড়েই আমার ফোনে আবার তার নোটিফিকেশন। আহ্! তুই জানিস না অয়ন সেসময় কেমন লাগছিলো আমার তার মেসেজ পেয়ে। আমি ভাবলাম স্রষ্ঠা হয়তো আমার কোনো দোয়া কবুল করেছেন। কল দেবার অনুমতি পেয়ে দেরি করলাম না আর। কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছো নীলা? প্রতিত্ত্যুর না দিয়ে এক রূঢ় ভাষায় আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে এতো সাহস কে দিয়েছে আমাকে নিয়ে লিখার? স্পর্ধা তো তোমার কম নয়! তুমি জানো মানুষ আমাকে কি বলছে তোমার লিখা নিয়ে?

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এমন অপ্রত্যাশিত কথোপকথন আমি মোটেও আশা করি নি। আমি ভাবতে লাগলাম যে, মানুষ কিভাবে জানলো যে আমি তাকেই নিয়ে লিখেছি? আমি তো ছদ্মনাম ও ছদ্মপরিচয়ে সব লিখেছি। নীলা বাদে আর কারো উপলব্ধি করা তো এক মূহুর্তের জন্যও সম্ভব নয়! তাহলে সে এমন রূঢ় ব্যবহার করছে কেনো আমার সাথে? সম্ভিত ফিরে এলো তার চিৎকার, চেচামেচি শুনে। আমাকে মূর্খ, অশিক্ষিত, গেঁয়ো, অকর্মণ্য বলে যাচ্ছে তাই ভাষায় বকাবকি করলো। তারপর শেষে এমন এক কথা বললো যা আমি কখনো যে শুনবো তা ভাবতেও পারি নি।”
বলতে বলতে অনন্ত’দার চোখ দুটো টলমল করে উঠল, যেনো কোনো বাঁধ ভেঙে জল আসতে চায়, কিন্তু থেমে গেল মাঝপথে। তার ঠোঁট কাঁপছিল, যেনো প্রতিটি শব্দ ভারী হয়ে গলায় আটকে গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো, বুকের ভেতর এক অদৃশ্য ভার যেনো তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

চোখগুলো ধীরে ধীরে বিস্ফারিত হলো, কিন্তু সে বিস্ময়ে নয়, এক গভীর বেদনার আঘাতে। যেনো তার পুরো অস্তিত্বটাই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। মুখে ফুটে উঠল এক নীরব আর্তি, যা কোনো ভাষায় প্রকাশের নয়।

খানিকক্ষণ পর কাঁধের স্লিং ব্যাগ থেকে পানির বোতল আর বেঞ্জোডায়াজেপিন গোত্রের একপাতা ঔষধ বের করে এনে দুটো নিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেললো। বেঞ্জোডায়াজেপিন গোত্রের ঔষধ তো এন্টি-অ্যাংজাইটি, সিডেটিভ, অ্যান্টিকনভালসেন্ট এবং মাসল রিল্যাক্সেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাহলে দাদা কি অ্যাংজাইটি কমানোর জন্য এ ঔষধ খাচ্ছেন, নাকি অন্য কারনে? নিজের মনে প্রশ্নগুলো বিড়বিড় করলাম আমি।

ধাতস্থ হতে খানিকটা সময় নিলো দাদা। পা দুটোর ভাঁজ খুলে সামনের দিকে ছড়িয়ে দিলো সে। সিগারেট ততক্ষণে পুরোটা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।
ব্যাগ থেকে আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে একটা লম্বা টান দিলো। তারপর আবার বলতে শুরু করলো,
“নীলার শেষ কথাগুলো ঠিক তীরের মতো এসে বিদ্ধ করলো আমার বুক। প্রথমে মনে হলো, শব্দগুলো যেনো বাতাসে ভেসে গেলো, কিন্তু পরে টের পেলাম, এগুলো আমার আত্মাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে গেছে। শ্বাস নিতে গিয়ে থেমে গেলাম, যেনো বুকের ভেতর ভারী পাথর জমে গেছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এলো, অথচ চোখের জল কোথাও আটকে গেলো, বেরোতে পারল না। মনে হলো, পৃথিবীটা থেমে গেছে, কেবল আমি দাঁড়িয়ে আছি শূন্যতার মাঝে। শব্দগুলো কানে বাজছে বারবার, প্রতিধ্বনির মতো। তার প্রতিটি বাক্য যেনো একটি নতুন ছুরির আঘাত, একবারে হৃদয়ের গভীরে গিয়ে প্রবেশ করছে। হৃদয়ের মধ্যে কোথাও যেনো এক গভীর শুন্যতার সৃষ্টি হলো। আকাশ, বাতাস, আলো সব হারিয়ে গেলো। কেবল রয়ে গেলো তার কথার ধ্বংসযজ্ঞ। মনে হলো, আমি নিজেই আমার অস্তিত্বের সীমানা হারিয়ে ফেলেছি।

নিজেকে সামলাতে পারি নি আমি আর। বারংবার মূর্ছায় নিজেকে এতোটা অসহায় কখনো মনে হয় নি। আমি তো এমন ছিলাম না, এতোটা অস্তিত্ব সংকট কখনো মনে হয় নিজের। আচ্ছা, আমি তো এমন ছিলাম না! নীলাকে একটি শেষ চিঠি লিখতে বসি তখন। হাত দুটো যেনো কাঁপছিলো আমার। চোখে এক সমুদ্র পরিমাণ জল নিয়ে লিখা শুরু করি। আমার বলা না বলা কথাগুলো অসমাপ্ত ভাবে লিখে তাকে পাঠিয়ে দেই। প্রাপক- নীলা মুখার্জি, প্রেরক- আমৃত্যু প্রশ্রয়ধন্য অনন্ত বিশ্বাস।

কি এক প্রচন্ড রকম মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে আজ। দুটো প্যারাসিটামল একসাথে নিয়েও কোনো নিস্তার নেই৷ বরং ক্রমান্বয়ে মাথার ভিতর কেউ যেনো কুড়াল দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করেই চলছে। কি এক আশ্চর্য রকমের ঔদ্ধত্য হলো আমার! কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টান নিয়ে গেলো আমাকে এক বিলেতি মদের দোকানে। তিন বড় পেগের হুইস্কি ঢকঢক করে গিলে খেলাম। মাথায় নেশা চড়া শুরু করলো ততক্ষণে। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। মাথা ব্যাথা কোথায় যেনো উদাও হতে লাগলো। আমি বিজয়ের হাসি হাসতে লাগলাম। নেশা চড়েছে মাথায়। দোকান থেকে বের হয়ে টালমাটাল ভাবে হাটতে থাকি। এক পা এগুচ্ছে তো আরেক পা পিছিয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতো মুখে মুখে বিড়বিড় করে কি সব বলতে লাগলাম। কারো দৃষ্টি নেই আমার উপর। ওয়াকিং লেনের সীমানা ভুলে অজান্তেই ধীরে ধীরে গাড়ির লেনের দিকে এগিয়ে গেলাম, যেনো এক চুম্বকের অদৃশ্য টানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।

গাড়ির হেডলাইটের ঝলকানি হঠাৎ করেই আমার দৃষ্টি চুরমার করে দিলো, কিন্তু সময় ততক্ষণে হাত ফসকে পালিয়েছে। ব্রেকের তীক্ষ্ণ শব্দ আর ধাতব সংঘর্ষের প্রতিধ্বনি রাতের বাতাস কাঁপিয়ে দিলো। আমার দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসলো।

তিনদিন পর নিজেকে আবিষ্কার করি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বেডে৷ শরীর যেনো একেবারে অচেনা হয়ে গেছে। মাথার চারপাশে সাদা ব্যান্ডেজ আর ডান পায়ের উপরে প্লাস্টার। আশপাশে অনেকেই জড়ো হয়ে আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই পরিচিত নয়। চোখে ধোঁয়াশা ভেদ করে নার্সের একটি মৃদু হাসিমুখ দেখতে পেলাম।
‘আপনি ভাগ্যবান, মিস্টার। এমন দুর্ঘটনার পরও বেঁচে আছেন। কিন্তু আপনাকে বেশ কিছুদিন এখানেই থাকতে হবে,’ নার্সের কথা কানে আসতেই মনে হলো যেনো আমার বুকে এক চাপা ঢেউ আছড়ে পড়লো। কতগুলো প্রশ্নের জটিল ও কঠিন সমীকরণ মেলেনি এখনো। মাথার ভেতর শুধু ঘুরপাক

খাচ্ছিলো, ‘আমি এখানে কেনো? কীভাবে এলাম?’

দিন গড়ানোর সাথে সাথে সেই স্মৃতি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করাও যেনো এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ হয়ে উঠলো। যতই চেষ্টা করি, অতীতের কোনো ছাপ ধরতে পারি না। সেই অসহ্য ব্যথা, নিজের ভেতরে জমে থাকা অপরাধবোধ, আর স্মৃতি ফিরে মুছে ফেলার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আমি ডাক্তারকে বললাম, ‘কিছু দিন সব ভুলে থাকতে চাই। দয়া করে এমন কোনো ঔষধ দিন যা আমাকে শান্তি দেবে।’

ডাক্তার প্রথমে অনাগ্রহ দেখালেও আমার অনুরোধের কাছে হার মানলেন। শুরু হলো স্ট্রেস রিলিজের ঔষুধ, যা বেঞ্জোডায়াজেপিন গোত্রের। প্রথম কয়েকদিন মনে হলো যেন স্বর্গে আছি। মন শান্ত, দুশ্চিন্তা নেই। ঘুম গভীর আর চিন্তাহীন। তবে ধীরে ধীরে এই ওষুধ এক নতুন রূপ নিয়ে আসতে শুরু করলো।

কয়েকমাস পর একদিন যখন ঔষুধের পাতার শেষ ট্যাবলেটটি খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি, তখন অদ্ভুত একটি অনুভূতি হলো। আমার স্মৃতির পাতা যেনো এক এক করে ধূসর হয়ে আসছে। মনে করতে চাইলেও কিছু ঠিকঠাক ধরা দিচ্ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতি স্মরণ করার চেষ্টা করলেই মাথার মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা ভর করছিলো। পরের দিন সকালে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, মনে হলো আমি নিজের চেহারাটাই ঠিক করে চিনতে পারছি না। তখনই ভাবলাম এটা কি আদৌ ঔষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, নাকি আমার মনের চাওয়া অনুযায়ী স্মৃতির ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে? আমি উপলব্ধি করলাম, এই ঔষুধ শুধুই মানসিক চাপ কমাচ্ছে না, বরং আমার অতীত মুছে ফেলার মতো এক দারুণ টোটকা হয়ে উঠেছে। আমার জীবনে এমন অনেক স্মৃতি আছে, যা আমি মুছে ফেলতে চাই, অপ্রাপ্তি, অপমান, হারানোর যন্ত্রণা। এই ঔষুধ কি তাহলে আমার মুক্তির পথ হতে পারে? কয়েকদিন ভেবে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি এটাকে আমার হাতিয়ার বানাব।

আমি ধীরে ধীরে ডোজ বাড়িয়ে দিলাম। দিনে একটির বদলে দুইটি, দুইটির বদলে তিনটি। প্রথমে মনে হলো কিছু অস্বাভাবিক লাগছে, কিন্তু প্রতিবারই যখন কোনো বিষাদগ্রস্ত স্মৃতি আমার মন ছুঁতে চাইলো, তখন মনে হলো সেটা কুয়াশার মতো উধাও হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পর নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করলাম। একটা অদ্ভুত সাহস আমাকে ভর করলো যা ছিলো, তা ভুলে যাওয়ার সাহস। কিন্তু পাশাপাশি একটা ভয়ও আমাকে গ্রাস করছিলো। আমি কি আমার পুরো সত্তাকেই হারাতে যাচ্ছি?

এই দোটানার মধ্যেই একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, কলকাতার এই কোলাহল আর যন্ত্রণা থেকে দূরে কোথাও গিয়ে নিজেকে খুঁজে বের করতে হবে। সাগরপাড়ের নির্জনতা আমাকে যেনো ডাকতে শুরু করলো। তারপর চলে এলাম কক্সবাজার। এখানে কেউ আমাকে চিনবে না, অতীতের কেউ আসবে না, আর আমি নিজেই নিজের অতীতের সাথে লড়াই করে যাবো। এখন যদিও এই ঔষধ নেয়া অনেকটা কমিয়ে দিয়েছি। আজ বিষন্নতা আমাকে গ্রাস করছে বলেই দুটো ঔষধ নিতে হলো।”

চুপ করলেন অনন্ত’দা। তার মুখে যেনো বিষণ্ণতার ঘন কালো মেঘ জমেছে, যা বৃষ্টি ঝরাতে চেয়েও থমকে গেছে। চোখের কোণে জল টলমল করছে, কিন্তু তা বাঁধ ভেঙে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না। দূরে কোথাও নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, যেনো দিগন্তের ওপারে তার শূন্যতা আর কষ্ট মিলে গেছে এক অবিনশ্বর সাগরে। তার চোখ-মুখে আঁকা অদৃশ্য রেখাগুলো স্পষ্ট বলছে, কতটা পাহাড়সম বোঝা বয়ে চলেছে সে।
আমি যেনো এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টের এই জীবন্ত প্রতিমূর্তির দিকে তাকিয়ে। মনে হলো, তার নীরবতাই এক গভীর আর্তনাদ, যার শব্দ কেবল অনুভব করা যায়, শোনা যায় না।
সা ক্ষা ৎ কা র “
আবদুল্লাহ আল মারুফ
১৮ জানুয়ারি, ২০২৫
এস্পো, ফিনল্যান্ড

 

Scroll to Top