শীতের শুষ্কতা কেটে এখন চারিপাশে গ্রীষ্মের রেশ। যদিও এখানকার আবহাওয়া এখনো খুব একটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠেনি, তবুও আকাশজুড়ে সূর্যের নিরবচ্ছিন্ন আলোর বিস্তার যেন জানান দিচ্ছে গ্রীষ্ম এসেছে। সূর্যের আর ডোবা ডুবি নেই, আলো যেন চারদিককে ঢেকে রেখেছে আপন আলোয়।
ঘরের বাইরে পা ফেলার তেমন প্রয়োজন হয় না। কম্পিউটারের পর্দায় কাজ, কিংবা পাতাজড়ানো বইয়ের পাতায় মন ঢুকে যাওয়া, এই নিয়েই দিন কেটে যায়। আজ হঠাৎই মনে হলো জমে থাকা কাজের স্তূপ থেকে মুক্তি চাই।
একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে আজ অপূর্ব সম্মোহন ছড়িয়ে আছে, সূর্যের তেজ আর মৃদু হাওয়ার মিতালী। সে বাতাস গায়ে এসে যেন অদ্ভুত এক শিহরণ জাগায়। পথের ধারে বুনোফুলেরা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, তাদের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে চারিপাশ। দূর থেকে ভেসে আসে পাখিদের কলতান, মনে হয় পরিযায়ীরা ঘরে ফিরে এসেছে। পায়চারি করতে করতে নিজেকে হারিয়ে ফেলি সময়ের গহ্বরে।
আমি একা একা হাঁটছি। সময় আর চারপাশ ভুলে আত্মবিস্মৃত হয়ে যাচ্ছি। মনে কোনে উঁকি দিতে থাকে কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু না বলা কথা, কিছু ব্যথাতুর মুহূর্ত…
মনে পড়ে এক বিকেলের কথা, আমার শৈশব। বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঝে একবার ঝগড়া বেধে যায়। সেই ঘটনা বাবা জানতে পেরে আমাকে কিছু না বলে মা’কে প্রচণ্ড রাগারাগি করেন। প্রত্যুত্তরে মা তখন কিছুই বলেননি, কেবল বার দুয়েক আমার দিকে তাকিয়েছিলেন অশ্রুসিক্ত চোখে। আজো মায়ের সেদিনের মুখখানি আমার চোখে স্পষ্ট ভাসে।
মনে পড়ে যায় আমার এক বন্ধুকে, যাকে আমি খুব মায়া করতাম, স্নেহ করতাম, ভালোবাসতাম। একদিন হঠাৎ সে হারিয়ে গেলো, আমার জীবন থেকে, আমার গল্প থেকে। যাবার আগে একবার বলেছিলো,
“তোর বাঁচা মরায় আমার কিছুই যায় আসে না।”
সে কথায় আমি প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম। সেই কষ্ট আজো আমার ভিতরে একটা দাগ হয়ে রয়ে গেছে। তবু তাকে আজো মনে করি, শ্রদ্ধাভরে ধন্যবাদ জানাই, তাকে হারিয়ে আমি হয়তো নিজেকে একটু ভালো করে চিনেছি।
এইসব ভাবনার ভেতরেই হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। দেশ থেকে মা ফোন দিয়েছেন। আমি দ্রুত পা বাড়ালাম ঘরের দিকে, মায়ের কণ্ঠস্বর শুনবো বলে। স্মৃতির মায়াজাল ছিন্ন করে ফিরে যাই ঘরের দিকে, যেখানে এখনও জ্বলজ্বল করে আমার শৈশবের আলো।
এস্পো, ফিনল্যান্ড
২৩ শে জুন, ২০২৫