Menu
Picture of Abdullah Al Marouf

Abdullah Al Marouf

Writer

Share this blog:

Bastet in the S h a d o w s

একটা প্রচন্ড ধাক্কা, একটা বিকট শব্দ, ধাতব কিছুর মোচড়ানো আওয়াজ। আর তারপর যেনো সব অন্ধকার হয়ে যাওয়া৷

তারপর শূন্যতা!

হটাৎ করে অনুভব করলাম কেউ যেনো টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। কোনো শক্ত হাত, কোনো অদৃশ্য অস্তিত্ব। আমি চিৎকার করতে চাইলাম। আমার গলা চেপে ধরা হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু শরীর যেনো পাথরের মতো ভারী।
বাঁচাও!
গলার স্বর বের হয় না, কন্ঠরোধ করে রেখেছে আমার কেউ৷
হটাৎ………

 

ধড়ফড় করে উঠে বসি। চোখদুটো ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে। বুকের ভেতর টিপটিপ শব্দ, যেনো ভিতরে একটা ঢোল বাঁজছে।
গায়ের নাইট রোবটি ঘামে ভিজে গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।

 

নাহ, আজ রাতেও ঘুম হলো না আর।

গাড়ি এক্সিডেন্টের পর থেকে এমন ট্রমাটিক ঘটনা অনেক রাতেই ঘটছে আমার সাথে।
বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিই। ইলেকট্রিক কেটলির সুইচ অন করে স্ট্যাডি টেবিলে বসে পড়ি৷ চা খাবো এক-কাপ। দেয়াল ঘড়িতে এখন রাত ২ টা বেজে ৪৪ মিনিট।
মানসিকভাবে অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি গত কয়েকদিনে।

 

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বুক শেল্ফ থেকে নীল মলাটের ডায়েরিটা আনমনে তুলে নিলাম। আমার দৈনন্দিন জীবনের দিনলিপি। তবে এটা পুরনো। এখন আর লিখি না এটাতে। এক একটা পাতা উল্টাচ্ছি আর পুরনো স্মৃতিতে ভেসে যাচ্ছি৷

কালো কালি দিয়ে লেখা কিছু লাইন, কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য, কিছু শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ। সব মিলিয়ে যেনো এক জীবনের অর্ধেক গল্প জমে আছে এই পাতাগুলোর ভাঁজে।

 

কিছু পাতা খুলতেই গায়ে লেগে থাকা পুরোনো দিনের গন্ধ ভেসে এলো। একটা বিকেলের কথা মনে পড়লো, যখন আমি প্রথমবার সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখেছিলাম। সেদিনের রঙিন আকাশের প্রতিফলন যেনো এখনও এই কাগজের শিরায় শিরায় লেগে আছে। আরেকটা পাতায় চোখ পড়তেই দেখা গেলো কয়েকটা নাম, কিছু না বলা কথা, কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষ, যারা একসময় খুব কাছের ছিলো, এখন শুধু স্মৃতির গভীরে লুকিয়ে আছে।

 

কিছু পাতা হাসির, কিছু পাতা বিষাদের। কোথাও কোথাও মনে হলো, পুরোনো আমি যেনো আমাকে দেখছে সেই পাতার ফাঁক দিয়ে। একটা সময়ের ফ্রেমে বন্দী হয়ে থাকা এক তরুণ, যার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়ার, যার চোখে ছিলো নতুন ভোর দেখার আগ্রহ।
হটাৎ একটা আধভাঁজ করা পাতা উল্টাতেই আমার শরীর বার দুয়েক কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। আমি ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। শিরোনামে লেখা- “Bastet in the Shadows”

সশব্দে ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। তারপর মুহূর্তখানেক তাকিয়ে রইলাম বন্ধ মলাটের দিকে, যেনো সেটার ভেতরে আটকে আছে কোনো গোপন সত্য, কোনো অভিশপ্ত গল্প।
গভীর শ্বাস নিতে চেষ্টা করলাম, মিনিট পাঁচেক ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা ভারি অনুভূতিগুলোকে ছড়িয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু তবুও মনে হলো, সেই গল্প এখনো আমার শিরদাঁড়ায় বরফ শীতল ছায়া হয়ে আটকে আছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর অবশেষে মনস্থির করলাম আজ আমি “Bastet in the Shadows” কাহিনীটি আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো।

বন্ধু মহলে গল্প বলা বা লেখার জন্য আমার বিশেষ খ্যাতি নেই, তবু আজ আনাড়ি হাতে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার এক অস্পষ্ট বিবরণ আপনাদের দিয়ে যাবো।
তবে সাবধান,
এই গল্প শুধু শব্দের খেলা নয়।
এটি এক অন্ধকারের ছায়া, যা একবার মন ছুঁয়ে গেলে, সহজে মুক্তি দেয় না…

 

আমি তখন ফিনল্যান্ডের এস্পো (Espoo) শহরের য়ুপিনমাকী (Joupinmäki) স্ট্রিটের এক নিরিবিলি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। শীতল হাওয়ায় মোড়ানো নিস্তব্ধ রাতগুলো ছিল আমার সঙ্গী, আর জানালার ওপাশে থাকা স্ট্রিটলাইটের ম্রিয়মান আলো যেন আমার একমাত্র নীরব সাক্ষী। দিব্যি আরাম আয়েশে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিলো। অফিস থেকে এসে দৈনন্দিন ঘরোয়া কাজ-কর্ম শেষ করে ডুব দিতাম বইয়ের সাগরে। শুধু বই বললে অবশ্য ভূল হবে, সাথে থাকতো বিভিন্ন গবেষণা পত্রের বিস্তর সমাহার। আমার মূল পড়াশোনার বিষয়বস্তু বাদে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকতাম বিভিন্ন জটিল, রহস্যময়, ও চমকপ্রদ বিষয় নিয়ে৷ বিজনেসের বিভিন্ন দিক যেমন অর্থনীতি, ফাইন্যান্স, সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট, কর্পোরেট বিজনেস স্ট্র‍্যাটেজি ম্যানেজমেন্ট, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, রিয়েল এস্টেট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি আমার মূল পড়াশোনার বিষয়বস্তু। তবে এসবের পাশাপাশি বহু বছর ধরে আমার আগ্রহ জন্মেছে হিউম্যান সাইকোলজি, ক্রিমিনোলজি, এবং সাইকোপ্যাথলজি নিয়ে। এসব নিয়ে খুঁটিনাটি পড়াশোনা করার চেষ্টা করতাম তখন। জটিল, রহস্যময় আর শীতল রোমাঞ্চ জাগানো অধ্যায়গুলো আমাকে টেনে নিয়ে যেত এমন এক জগতে, যেখানে মানুষ কখনো দর্শক, কখনো শিকার, আবার কখনো হান্টার।

 

কোনো এক ডিসেম্বরের এমনি এক দিনে অফিস শেষ করে বাসায় এসে নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়াকর্মের পাঠ চুকিয়ে বসলাম পড়ার টেবিলে। শীতল বাতাস জানালার কাঁচে ধাক্কা দিচ্ছে। বাইরে স্নো-ফল হচ্ছে সকাল থেকেই। শুভ্র-সাদা স্নো’তে ভরে গেছে পুরো শহর। দিন ছোট বলে বাইরে অন্ধকার হয়েছে খানিকক্ষণ আগেই।

সংগত কারনেই রাশিয়ায় বহুবছর আগে ঘটে যাওয়া একটা হোমিসাইডাল কেস নিয়ে বসলাম। হোমিসাইড থেকে সিরিয়াল কিলিংয়ে রূপ নেয় এই কেসটি। আমি নিবিড়ভাবে যাবতীয় তথ্য-উপাত্তের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলাম।
ভিকটিম ও সাসপেক্টদের প্রোফাইলিং, প্রতিটি সাসপেক্টের এলিবাই, ফরেনসিক এভিডেন্স, মডাস অপারেন্ডি, রেড হেরিং, ম্যানস রেয়া, অ্যাক্সেসরি টু ক্রাইম, বিহেভিয়ারেল এনালাইসিস এন্ড প্রোফাইলিং অতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়তে ও বুঝতে চেষ্টা করলাম।

 

স্টাডি টেবিলে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকার পর হঠাৎ শরীরে টের পেতে লাগলাম একটা অসাড়তা, একটা ক্লান্তিকর অবসাদ। আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াতেই পায়ের নিচে এক অদ্ভুত ঝিমঝিমে অনুভূতি। মনে হলো, একটু হাঁটাহাঁটি দরকার।

চোখ গেল টেবিলের পাশে রাখা ওয়েস্টবিনের দিকে। ছেঁড়া কাগজে ঠাসা, যেনো নিজের ভেতরে অতিরিক্ত বোঝা জমে গেছে। ভাবলাম, এটাকে ফেলে আসি, একদিকে হাঁটাও হবে, অন্যদিকে ঘরের এক কোণা হালকা হবে।
যে কথা, সেই কাজ।

 

একটা লংপ্যাড জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা ঠেলে বের হলাম। শীতের হালকা হাওয়া চুলের ভেতর দিয়ে ছুঁয়ে গেলো। আমাদের বিল্ডিংয়ের ওয়েস্ট কালেকশন পয়েন্ট বেশ খানিকটা দূরে। প্রায় ১০০ মিটার। কাঠ দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট জায়গা, মাথার ওপর চাল বসানো, যেনো এক নিঃশব্দ চৌকাঠ, যেখানে শহরের অবাঞ্ছিত জিনিসগুলো এসে আশ্রয় নেয়।
চারপাশ সাদা বরফে ঢাকা, স্নো এখনও অক্ষত। ক্লিনিং স্টাফদের ছোঁয়া এখনো পড়েনি। পায়ের নিচে কড়মড় শব্দ তুলে আমি ধীরে ধীরে বরফ মাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। গুণগুণ করে সুর ধরলাম গলায়-“কারা যেনো ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিলো…”
অন্ধকার নির্জন পথ, নিঃশব্দ রাত, আর বরফের উপর আমার একলা পায়ের ছাপ।

ওয়েস্ট কালেকশন পয়েন্টের দরজায় হাত রাখতেই ধাতব ঠান্ডা অনুভূত হলো। চাবিটা ঘোরানোর সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠলো ৬০ ওয়াটের নিয়ন আলোর বাল্ব। আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ ঝলসে উঠলো।

 

কাঠের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সেই আলো ছড়িয়ে গেলো বাইরে, বরফের উপর তার এক টুকরো প্রতিবিম্ব রেখে।
আমি নির্দিষ্ট বিনে ময়লা ফেলে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। অন্ধকারের ভারি নীরবতার মাঝে, দরজার কাঠের ফাঁক দিয়ে যেনো একটা অস্পষ্ট অস্তিত্বের আভাস পেলাম।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, কেউ কি আমাকে দেখছে?

 

অদৃশ্য এক ভয়ে শরীরের ভেতর শীতল একটা স্রোত বইতে শুরু করলো। তবুও ভয় সরিয়ে রেখে হাত বাড়ালাম দরজার হাতলে। কিন্তু ঠিক তখনই—
টক!
ওপাশ থেকে কেউ দরজাটা এক ঝটকায় খুলে দিলো!
আমার পুরো শরীর শিউরে উঠলো। রিফ্লেক্সের মতো দু’পা পিছিয়ে এলাম। শ্বাস ভারী হয়ে আসছে। কপালের ঘাম ঠান্ডা বাতাসে আরও ঠান্ডা হয়ে উঠছে।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।

একজন মহিলা, বয়স ৫০-৬০, হাতে একটা ওক কাঠের লাঠি। কিন্তু সে একজন সাধারণ বৃদ্ধা নয়, কারণ তার চেহারার দিকে তাকাতেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেলো।
এমন বীভৎস, বিদঘুটে চেহারা আমি কোনোদিন দেখিনি। মনে হলো, একটা অভিশপ্ত আত্মা মানুষের চেহারার একটা ভাঙা মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে আছে।

তার চোখ! ওহ গড!

বিড়ালের মতো সংকীর্ণ, হিংস্র এক দৃষ্টি। তার চোখের গভীরে এক অন্ধকার, যেনো সে শুধু দেখছে না, আমাকে শিকার হিসেবে বিচার করছে। মনে হলো, এই বুঝি ভয়ানক থাবায় আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
তার হাতের দিকে তাকাতেই গা শিউরে উঠলো।

এক হাতে লাঠি, যার হাতলে খোদাই করা মিশরের দেবী বাস্তেটের মুখ! অন্য হাত খালি।
তাহলে সে এখানে কেনো? ওয়েস্ট কালেকশন পয়েন্টে কী তার কাজ?

মনে হলো, আমার পায়ের নিচের জমাট বরফের চেয়েও বেশি শীতল কিছু মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে আসলো।

তারপর…

সে খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
সেই হাসি!

ভয়ঙ্কর, বিকৃত, শিরদাঁড়া চিড় ধরা এক শূন্যতার হাসি!
আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসতে লাগলো। শরীরের রক্ত যেনো জমে গেলো।
ঠিক তখনই আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করা ঘণ্টার শব্দ!
রাত ১০টার চার্চের ঘণ্টা!

শব্দটা যেনো আমার অবশ শরীরে একটা ঝড়ের মতো আঘাত করলো। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে এক দৌঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পিছন ফিরে দেখার সাহসও হলো না।
স্নো জমে থাকা রাস্তা মাড়িয়ে, ভয়ার্ত হরিণের মতো প্রাণপণে ছুটতে থাকলাম। বিল্ডিংয়ের সদর দরজার কাছে পৌঁছে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিলাম, দরজার অটোমেটেড লক খুলে ভেতরে ঢুকে গেলাম।

দরজা বন্ধ করেই পাগলের মতো সেটা আটকে দিলাম। বুকের ধুকপুকানিতে মনে হলো, হৃৎপিণ্ড যেনো ভেঙে বেরিয়ে আসবে।

তারপর…

 

আমি কম্বল মুড়িয়ে চুপচাপ বসে থাকলাম। ঘরের উষ্ণতাও আমার শরীরের শীতল আতঙ্ক দূর করতে পারলো না।
সেই রাতেই ভয়ঙ্কর জ্বরে কাবু হয়ে গেলাম।
রাতজুড়ে আবোল-তাবোল, বিভীষিকাময় স্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। কখনো সেই চোখ, কখনো সেই হাসি, কখনো সেই লাঠির দেবীমূর্তি, মিশরের ভয়ানক হিংস্র ও অভিশপ্ত দেবী বাস্তেট।

সব যেনো এক কুৎসিত বাস্তবতার মতো আমার মনের উপর ছায়া ফেলেছিলো।

সেই ঘটনার পর থেকে, আর কখনো সন্ধ্যার পর ওয়েস্ট কালেকশন পয়েন্টের পথ মাড়াইনি।

 

২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
এস্পো, ফিনল্যান্ড

Scroll to Top