Menu
Abdullah Al Marouf
Picture of Abdullah Al Marouf

Abdullah Al Marouf

Writer

Share this blog:

অ স মা প্ত উপাখ্যান

মাঝেমধ্যে শীতলক্ষ্যার এই দিকটায় ঘুরতে আসি। আজ আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও মনের মধ্যে জমে থাকা এক অজানা অস্থিরতা দূর করতেই আসতে হলো। লোকজনের আনাগোনা খুব কম আজ। ঝরা পাতার মর্মরে প্রকৃতির বিষন্নতা যেনো লুকিয়ে আছে, প্রতিটি পতন যেনো এক একটি স্মৃতি মুছে যাওয়ার গল্প। হাঁটতে হাঁটতে একটি মাটির টিলার উপর এসে বসলাম। নদীর ওপারে তাকাই। কিছু অর্ধনগ্ন শিশু ডুব সাঁতারে মেতে উঠেছে। এক গৃহস্থ কয়েকটি গরু নিয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। ক্ষানিকক্ষণ বাদে বাদে দু-চারটে বালুর ট্রলার কোথাও যেনো মিলিয়ে যাচ্ছে। এতসব দেখতে দেখতে কোথাও যেনো নিমগ্ন হয়ে গেলাম।

 

আকাশে মেঘেদের মৃদঙ্গ বিলাপে সম্বিৎ ফিরে এলো। দক্ষিণী ঝড়ের দমকা হাওয়া যেনো এক বেহিসেবী কবি, যার শব্দে শব্দে প্রকৃতি ঢেকে যায় দুঃখের কাব্য দিয়ে। এই বাঁধ ভাঙা হাওয়া যেনো প্রকৃতির হৃদয়ের সেই চঞ্চল স্পন্দন, যা সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়। নদীর ওপারে তাকাই। ঝড়ের পূর্ভাবাস পেয়ে লোকজনের চলাচল অনেকটা কমে গেছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাতাসের বেগের তীব্রতা যেনো এক বিরহের গল্প, যা কোনো বাঁধা মানতে চায় না, শুধু সবকিছুকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে রেখে যায়৷ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আমিও ছুটে চললাম শীতলক্ষ্যার গাঁ বেয়ে উঠা ব্রিজের নিচে।

এমনই এক সময়ে বাতাসের তীব্রতার সাথে একগাদা ময়লার দলা উড়ে এসে পড়লো আমার পায়ের কাছে। শুকনো পাতা, গাছের ছোট ছোট ডালপালা, প্লাস্টিক ও কিছু কাগজের টুকরো। তার সাথে নীল মলাটে ওটা কি? ডায়েরি?

 

বাতাসের তালে দোল খাচ্ছে ডায়েরির পাতাগুলো, যেনো প্রতিটি পৃষ্ঠায় লুকানো স্মৃতিরা হাওয়ায় ভেসে উড়তে চাইছে।
কুড়িয়ে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই নিলাম। ধুলোবালি আর পানির সংস্পর্শে অনেকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে ডায়েরিটার। আমি পাতা উল্টে দেখতে শুরু করলাম। কিছু পাতার আংশিক কিছু লেখা পড়া যায়। নাম-ঠিকানা বিহীন কারো দিনলিপি। কৌতুহল জন্মালো খুব। আমি আরো গভীরভাবে জানতে চাইলাম ডায়েরিটা সম্পর্কে। কিছু পাতায় কিছু বিশেষ দিনের নোট, কারো সাথে দেখা, আজ দিনটি কেনো ভালো গেলো, শেষ চিঠি……!

একি? শেষ চিঠি? মানে? আমি চোখের আরো সামনে নিয়ে এনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। নাহ, পানি আর বালুর স্পর্শ পেয়ে কয়েকটি পাতার অবস্থা যারপরনাই। তারপরের দুটো পাতা আবার কোনোমতে পড়ার যোগ্য। গুটিগুটি হাতে লেখা৷ কোনো পুরুষের হবে বলে মনে হলো।

আমি পড়তে শুরু করলাম-

 

“হায় খোদা, ওমন কথা যদি হুনবার দিলা তায় মরণ দিলা না ক্যান? ওমন পাষাণ হৃদয়ের মাইনষের লগে পরিচয় করাইলা ক্যান আমারে? আমারে কিনা কয় আমার বাঁচা-মরাতে তার কিছু যায় আহে না! অথচ হপ্তা দুয়েক আগেও কইলো, বিয়া করবা আমারে অভীক?

মানুষ কিভাবে এতোটা বদলে যায় তা আমি বুঝি না। আমার এই স্বেচ্ছা মৃত্যুর দায় আমি কাউকে দিবো না, এমনি কি নীলিমা’কেও না। গত দু-সপ্তাহে কতবার মূর্ছা গিয়েছি তা বলতে পারবো না। একটাই প্রশ্ন করি বারবার নিজেকে। নীলিমা কি তবে আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছিলো? কোনো উত্তর মেলে নি আমার। নীলিমা এতটা বদলে গেলো কিভাবে? আমাকে মূর্খ, বাউন্ডুলে, পথের কাঙাল বলে অপমান করেও ক্ষান্ত হয় নি। সে বললো, আমার বাঁচা-মরাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। এও সম্ভব? আমি কি করে বুঝাবো তাকে এ যন্ত্রণা? তাকে মনে হলো নতুন করে আবিষ্কার করছি আমি। বুকে অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি হয়েছে। মাথাটা সারাদিন ভনভন করে। চোখে আবছা দেখি। হাঁটতে পারি না ঠিকমতো। পা টলমল করে৷ কাজকর্ম সব বাদ দিয়েছি। ঢাকায় চলে যাচ্ছি। বাসে এখন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না আর। কোথাও নিজেকে বিলীন করে দিবো।
আমার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। ভালো থেকো নীলিমা।

ইতি,

আজন্ম প্রশ্রয়ধন্য….”

 

পড়া শেষ করলাম। পরের পাতাগুলোতে আর কিছু নেই। ডায়েরিটা বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকালাম। কয়েকসপ্তাহ আগে এই শীতলক্ষ্যায় একটা লাশ পাওয়া গেছে। মার্ডারের কোনো চিহ্ন ছিলো না শরীরে। লাশটার অধিকাংশ ভাগ পঁচে গিয়েছে। চেহারাও বোঝার কোনো উপায় ছিলো না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলো অবশেষে। এই শহরে খুনি নেই। অথচ প্রতিদিন কত স্বপ্ন খুন হচ্ছে তার হিসেব কেউ রাখে না।

মেঘেরা আকাশে দুঃখের রঙ মেখে এসেছে, যেনো পৃথিবীর চোখে তারা বৃষ্টির অশ্রু হয়ে ঝরবে৷ নিস্তব্ধ নদী যেনো দুঃখী মন, তার ধীর গতিতে বয়ে যায় নীরব কান্নার স্রোত। আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে আনি। ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে আমিও পা বাড়ালাম বাসার দিকে। চোখের কোনায় কখন যে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো তার অস্তিত্ব টের পাই নি৷

 

নভেম্বর ২, ২০২৪
Espoo, Finland

Scroll to Top